
তিন এমপির নিয়ন্ত্রণে বৃহত্তর মিরপুরের আওয়ামী লীগের রাজনীতি। এই এমপিদের ঘিরে রেখেছে চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসী আর মাদক ব্যবসায়ীরা। অনেকেই দুঃখ ও অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
অমরেশ রায়
তিন এমপির নিয়ন্ত্রণে বৃহত্তর মিরপুরের আওয়ামী লীগের রাজনীতি। এই এমপিদের ঘিরে রেখেছে চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসী আর মাদক ব্যবসায়ীরা। অনেকেই দুঃখ ও অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ফলে মিরপুরে দলীয় কার্যক্রম অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়েছে। বৃহত্তর মিরপুর হিসেবে পরিচিত এই এলাকা মিরপুর ও পল্লবী_ এই দুই থানায় বিভক্ত ছিল। আয়তন ও জনবসতি বাড়ায় কাফরুল, দারুসসালাম, শাহআলী, রূপনগর ও ভাসানটেক থানা যোগ হয়েছে। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচন থেকে এখানকার আসন একটি থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিনটিতে।অভিযোগের তীর তিন এমপির দিকে
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর স্বভাবতই তিন এমপি ঢাকা-১৪ আসনের আসলামুল হক আসলাম, ঢাকা-১৫ আসনের কামাল আহমেদ মজুমদার এবং ঢাকা-১৬ আসনের ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর নিয়ন্ত্রণে দলীয় কার্যক্রম। ‘নিজস্ব লোক’ দিয়েই তারা পরিচালনা করছেন সব কার্যক্রম। তাদের ঘিরে অন্য দল থেকে আসা সুবিধাভোগী, এমনকি অপরাধে জড়িত অনেকেরই আনাগোনা বেড়েছে_ এমন অভিযোগও রয়েছে।সরেজমিন জানা গেছে, অধিকাংশ থানা-ওয়ার্ডেই নেই দলীয় কার্যালয়। কামাল মজুমদারের মিরপুর-১১-এর নিজ কার্যালয় ‘মোহনা’, ইলিয়াস মোল্লাহর মিরপুর-১২-এর নিজস্ব মার্কেটেরভেতরের অফিস এবং আসলামুল হক আসলামের পুরাতন গাবতলীর প্রথম কলোনির বাসাসহ অফিসেই চলে দলীয় কার্যক্রম।
বৃহত্তর মিরপুরের সব থানা-ওয়ার্ডের সম্মেলনও হয়েছে গত বছর। কোথাও কমিটি গঠিত না হওয়ায় দলীয় কার্যক্রমে নতুন করে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। ফলে স্থানীয় এমনকি কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচিগুলোও সেভাবে সফল হচ্ছে না। তিন এমপিই নিজ নিজ থানা-ওয়ার্ডের ‘প্রস্তাবিত কমিটি’ জমা দিয়েছেন নগর আওয়ামী লীগের কাছে। এই সুযোগে এমপিদের নিজস্ব লোকজন থানা-ওয়ার্ডের ‘প্রস্তাবিত’ কমিটির নেতা পরিচয় দিয়ে সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নিতে শুরু করেছেন। তারাই আবার দলের থানা-ওয়ার্ড কমিটির বড় বড় পদ বাগিয়ে নিতে তৎপর।অভিযোগ রয়েছে, তিন এমপির কাছেই দল ও সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের ত্যাগী, দক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীরা অনেকটাই অপাঙ্ক্তেয়। ২০০১ সালের পর চরম অত্যাচার-নির্যাতন ও হামলা-মামলার মুখেও এলাকায় দলকে টিকিয়ে রেখেছিলেন, এমন নেতারাও উপেক্ষার শিকার হয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন।
একাধিক নেতা জানান, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি কামাল আহমেদ মজুমদারের ‘কাছের লোক’ হিসেবে পরিচিত মতিউর রহমান মাইকেলের মাধ্যমেই মূলত চলছে তার এলাকার দলীয় কার্যক্রম। তার বিরুদ্ধে রয়েছে নানা সমালোচনাও। আর আগে থেকেই পল্লবী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতির পদে থাকা ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর আশপাশ ঘিরে রয়েছেন হাজী বাতেন, মনু মোল্লা, জিন্নাত আলী, আবদুস সাত্তার, হাজী রজ্জব ও কাজী জহিরুল ইসলাম মানিক নামে কয়েক ব্যক্তি। তাদের অনেকেই এমপির নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসাসহ নানা অপকর্মে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। ইলিয়াস মোল্লাহর এপিএস সারোয়ার আলমের বিরুদ্ধেও রয়েছে অভিযোগ। এই এমপিকে ঘিরে থাকা ব্যক্তিদের কয়েকজন আবার বিএনপিসহ অন্য দলের রাজনীতি থেকে রাতারাতি ‘আওয়ামী লীগার’ বনে সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নিচ্ছেন। আসলামুল হক আসলামের বিরুদ্ধে বিএনপি থেকে আসা লুৎফর রহমান ও ওয়ার্ড বিএনপি সভাপতি হাজী আবদুর রহমানের গাবতলী গরুর হাটসহ কয়েকটি হাট-ঘাটের ইজারা নেওয়ার অভিযোগ নিয়েও ক্ষুব্ধ এলাকার সাধারণ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা।এদিকে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচনের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন এমপিদের ঘিরে থাকা নেতাদের অনেকে। আর প্রকৃত নেতাদের অনেকেই দলীয় পরিচয় নয়, স্বতন্ত্র হিসেবেই নির্বাচন করার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন সমকালের কাছে। এমন কয়েক নেতা বেশ ক্ষোভের সঙ্গেই বলেছেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে, সিটি নির্বাচন ঘোষণা হলে দেখা যাবে, সেখানেও এমপিদের ঘিরে থাকা ‘হাইব্রিড নেতারাই’ দলীয় সমর্থন পেয়ে যাবেন। সেক্ষেত্রে স্বতন্ত্র পরিচয়ে নির্বাচন করা ছাড়া তাদের আর গত্যন্তর থাকবে না।
এদিকে ত্যাগী ও দক্ষ নেতারা নিজেদের রাজনীতি থেকে গুটিয়ে নেওয়া এবং এমপিদের তেমন প্রতিপক্ষ না থাকায় আক্ষরিক অর্থে অভ্যন্তরীণ-দ্বন্দ্ব কোন্দলের তেমন একটা খোঁজ মেলেনি। তবে গত নির্বাচনের প্রার্থিতা নিয়ে কামাল আহমেদ মজুমদারের সঙ্গে দলের কাফরুল থানা কমিটির বর্তমান সভাপতি জামাল মোস্তফা এবং ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর সঙ্গে নগর আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সর্দার মোহাম্মদ মান্নান কচির দ্বন্দ্ব রয়েছে। জামাল মোস্তফা দলীয় প্রার্থী কামাল মজুমদারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ওই নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন। অবশ্য পরে আরেক বিদ্রোহী প্রার্থী এখলাস উদ্দিন মোল্লাহকে সমর্থন দিয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন। অন্যদিকে সর্দার মোহাম্মদ মান্নান কচি ঢাকা-১৬ আসনে দলীয় প্রার্থী ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন।মিরপুর থানা আওয়ামী লীগের বর্তমান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সেলিম খান বলেন, এখানে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে হলে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনাকে দলের দিকে নজর দিতে হবে। অতীতের মতো সমাজে গ্রহণযোগ্য ও ত্যাগী নেতৃত্বকে খুুঁজে বের করে দলের দায়িত্ব দিতে হবে। হাইব্রিড নেতাদের হাত থেকে দলকে রক্ষা করতে হবে। অন্যথায় বৃহত্তর মিরপুরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিয়ে দুশ্চিন্তা বেড়ে যাবে।মিরপুর থানা আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক এসএম হানিফ অবশ্য ভিন্ন কথা বলেছেন। তার দাবি, মিরপুরে আওয়ামী লীগ অত্যন্ত সুসংগঠিত। এখানে স্থানীয় এমপিদের নেতৃত্বে সবাই এক রয়েছেন। মূল দলসহ সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন_ কোথাও নিজেদের মধ্যে কোন্দল নেই।
এমপিরা যা বললেন :ঢাকা-১৬ আসনের এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর বক্তব্য জানা যায়নি। তবে অন্য দুই এমপি কামাল আহমেদ মজুমদার ও আসলামুল হক আসলাম বৃহত্তর মিরপুরে দলীয় কার্যক্রমে স্থবিরতাসহ ত্যাগী নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়নের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সমকালকে তারা বলেছেন, এখানে আওয়ামী লীগ ও এর সব সহযোগী সংগঠনই অত্যন্ত সুসংগঠিত। কোথাও কোনো কোন্দল ও দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদের লেশমাত্র নেই। নেতাকর্মী সবাই ঐক্যবদ্ধ থেকেই দলীয় কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছেন। তারা নিজেরাও নেতাকর্মী ও জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করে চলেছেন।দুই এমপিই নিজস্ব লোকদের দিয়ে দল পরিচালনা এবং বিএনপি-জামায়াতসহ অন্যান্য দল থেকে আসা লোকদের পাশাপাশি চাঁদাবাজ-টেন্ডারবাজ-মাদক ব্যবসায়ীেেদর আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন। তাদের ভাষায়, প্রকৃত ও দক্ষ নেতাদের দিয়েই থানাগুলোর ‘প্রস্তাবিত কমিটি’ নগর নেতাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা ও নগর নেতারা অনুমোদন দিলেই এসব কমিটি আরও অধিক সক্রিয়তার সঙ্গে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। অন্য দল থেকে আসা সুবিধাভোগী কিংবা চাঁদাবাজ-টেন্ডারবাজদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার সম্ভাবনা কিংবা ইচ্ছাও তাদের নেই। বরং তাদের নামে কেউ চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি করার চেষ্টা করলে পুলিশ ও প্রশাসনকে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান আগে থেকেই জানিয়ে রেখেছেন তারা।
কামাল আহমেদ মজুমদার বলেন, সব থানা-ওয়ার্ডেই দলীয় কার্যালয় রয়েছে। আর জনগণের সেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বলেই তার নিজস্ব কার্যালয় ‘মোহনার’ মাধ্যমে জনগণের সমস্যা সমাধান ও এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন তিনি। এতে দোষের কী আছে? মতিউর রহমান মাইকেলের মাধ্যমে দলীয় সব কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কাফরুল থানা আওয়ামী লীগের বর্তমান সহসভাপতি মাইকেল আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী এবং একজন টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব। থানা সম্মেলনে সব কাউন্সিলর তাকে প্রস্তাবিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে প্রস্তাব করেছেন। তিনি যদি দলীয় কার্যক্রমে ভূমিকা রাখেন, তাহলে সমস্যা কোথায়!আসলামুল হক আসলাম বলেছেন, হাট-বাজারের টেন্ডার যারা নিচ্ছেন, তারা সরকার ও সিটি করপোরেশনের মাধ্যমেই নিচ্ছেন। এগুলো দেখা তার বিষয় ও কাজও নয়। এ নিয়ে কোনো রকম মাথাও ঘামান না তিনি।
পাঠকের মতামত